পবিত্র রমজান মাস মহান আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত, নাজাতের মহিমান্বিত সময় আর পবিত্র রমজান মাসের বিশেষ ইবাদতের মধ্যে তারাবির নামাজের মূল্য অনেক বেশি অপরিসীম। ইশার নামাজের পর আদায় করা তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ মুসলমানদের রাতের ইবাদতকে প্রাণবন্ত করে তোলে আর কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে তবেঃ তারাবির নামাজ রাকাত সংখ্যা কত? তারাবির নামাজ আট ( 8 ) না বিশ ( 20 ) জামাতে পড়ার বিধান আর পুরুষ আর মহিলাদের তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম বা তারাবির নামাজের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আর বিভ্রান্তি রয়েছে আর সেজন্যঃ সহিহ হাদিস আর সাহাবিদের আমল বা ইসলামী ফিকহের আলোকে তারাবির নামাজের সঠিক রাকাত আর নিয়মের বিষয় নিয়ে স্পষ্টভাবে জানা জরুরি। আমাদের স্মার্ট ব্লগ জোনের আজকের কনটেন্টে আমরা জানবোঃ
👉 তারাবির নামাজ কত রাকাত পড়তে হয়?
👉 আট রাকাত তারাবির নামাজ পড়লে হবে?
👉 আট রাকাত তারাবির নামাজ পড়ার দলিল
👉 তারাবির নামাজ আট রাকাত না বিশ রাকাত
কোনটি সবচেয়ে বেশি সহিহ আর গ্রহণযোগ্য?
👉 পুরুষ আর মহিলাদের জন্য তারাবির নিয়ম?
👉 পুরুষ আর মহিলাদের জন্য কি নিয়ম সমান?
👉 তারাবির নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম কী কী?
👉 তারাবির নামাজ জামাতে পড়া কি জরুরি?
👉 আট রাকাত বনাম বিশ রাকাত তারাবির
নামাজ নিয়ে বিতর্ক থাকার কারণ কী কী?
👉 কোনটি অনুসরণ করা উচিত হবে?
তারাবির নামাজ সম্পর্কিত সেই সব বিষয় নিয়ে
শরিয়তের বিধান সহজভাবে জানার চেষ্টা করবো
তারাবির নামাজ কত রাকাত 🤔 🤔 🤔🤔🤔
আট রাকাত তারাবির নামাজ পড়লে কি হবে?
তারাবির নামাজ কত রাকাত পড়া লাগবে সেই
সংখ্যা নিয়ে আলেম উলামাদের মধ্যে কিন্তু দুইটি
প্রধান মত রয়েছেঃ
🟠 তারাবির নামাজ বিশ রাকাত পড়তে হয় আর
( 20 ) রাকাত তারাবির নামাজ পড়ার মত হচ্ছে
( অধিকাংশ উলামার মত )
হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি, হাম্বলি সেই চারটি
মাযহাবের অধিকাংশ আলেম উলামাদের মতে
তারাবির নামাজ হচ্ছে বিশ ( 20 ) রাকাত আর
তার দলিল হিসেবেঃ
• সাহাবিদের যুগে বিশ রাকাত প্রচলিত ছিলো
• খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব ( রাঃ ) বিশ
রাকাত তারাবির নামাজের জামাত চালু করেন
• মুসলিম বিশ্বের বিশ রাকাত ঐতিহ্যগত আমল
• ইসলামী ইতিহাসে প্রায় সর্বত্র কিন্তু বিশ রাকাত
তারাবির নামাজ প্রচলিত হয়েছে যথাক্রমেঃ
মক্কা, মদিনা, ভারত, বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশে
তাই 👉 অধিকাংশ ফকিহদের মতেঃ
তারাবির নামাজ রাকাত বিশ ( 20 ) রাকাত
তারাবির নামাজ পড়া হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদা
আট রাকাত তারাবির নামাজ পড়ার দলিল
তারাবির নামাজ আট রাকাত পড়লে হবে?
আট রাকাত তারাবি পড়ার মতবাদি হচ্ছেন
কিছু আলেমের মতে তারাবি আঠ ( 8 ) রাকাত
তারা হাদিসকে দলিল হিসেবে দেনঃ
👉 রাসুল ﷺ রমজান আর অন্য সময়ে ( 11 )
রাকাতের বেশি নামাজ পড়তেন না ( বুখারি )
👉 সেখানে আট ( 8 ) রাকাত তারাবি + তিন
( 3 ) রাকাত বিতর নামাজ হিসেবে রাখা হয়
তবেঃ অধিকাংশ মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা হলোঃ
সেই হাদিস হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাজ সম্পর্কিত
সেটা তারাবির নামাজ সম্পর্কিত হাদিস নয়
কোনটি বেশি সহিহ আর গ্রহণযোগ্য?
ফিকহের দৃষ্টিতে তারাবির নামাজ পড়া হচ্ছে
• বিশ ( 20 ) রাকাত + সাহাবিদের ইজমা ভিত্তিক
• আট ( 8 ) রাকাত + ব্যক্তিগত আমল ভিত্তিক
সেজন্যঃ ইসলামী জুরিস্টদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে
⭐ বিশ রাকাত তারাবি হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদা
⭐ আট রাকাত তারাবি নফল হিসেবে বৈধ
সহজ কথায় বললেঃ আট ( 8 ) রাকাত তারাবির
নামাজ পড়লে নামাজ হবে কিন্তু পুরোপুরি সুন্নাহ
আদায় হবে না সেটাই অধিকাংশ আলেমের মত
পুরুষ আর মহিলাদের জন্য তারাবির নিয়ম?
পুরুষ আর মহিলাদের জন্য কি নিয়ম সমান?
পুরুষ আর মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজের মৌলিক নিয়ম কিন্তু একই আর উভয়ের জন্যই রমজান মাসে এশার নামাজের পর আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইবাদত। তারাবির নামাজ সাধারণতঃ দুই ( 2 ) রাকাত করে পড়া হয় আর অধিকাংশ ফকিহ আর সাহাবিদের আমল অনুযায়ী ( 20 ) রাকাত তারাবির নামাজ পড়াই হচ্ছে পুরোপুরি সুন্নাহ হিসেবে বিবেচিত। যদিও ও আট ( 8 ) রাকাত পড়লে নামাজ সহিহ আর বৈধ হয়। পার্থক্য হচ্ছে আদায়ের ক্ষেত্রেঃ পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাতে তারাবি পড়া বেশি উত্তম আর সুন্নাহসম্মত আবার মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজ ঘরে পড়া উত্তম। নারীরা চাইলে ঘরে একা একা অথবা মহিলাদের জামাতে পড়তে পারেন। তারাবির নামাজ রাকাতের সংখ্যা আট বা বিশ উভয়ের জন্য একই বিধানাধীন কিন্তু উত্তম আমল হিসেবে পুরুষদের মসজিদে আর নারীদের ঘরে বিশ রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করাই অধিক ফজিলতপূর্ণ।
তারাবির নামাজ কিভাবে পড়তে হয়? ????
তারাবির নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম কী কী
তারাবির নামাজ ইশার নামাজের পর আদায় করা হয় এবং সাধারণ নামাজের নিয়মেই পড়তে হয়। সঠিকভাবে আদায়ের ধাপগুলো হলো:
নিয়ম ⭐ ইশার নামাজের সুন্নত, ফরজ, সুন্নত
আর চাইলে নফল নামাজ আদায় করে তারপর
তারাবির নামাজ পড়ার জন্য প্রস্তুত হতে হয়
নিয়ম ⭐ তারাবির নামাজের নিয়ত করার নিয়ম
হচ্ছে তারাবির নামাজের জন্য দুই ( 2 ) রাকাত
করে পরপর সুন্নত নামাজের নিয়ত করতে হয়
নিয়ম ⭐ তাকবিরে তাহরিমা বলে হাত বাঁধার
পর সানা আর সূরা ফাতিহার সাথে অন্য কোনো
সূরা অথবা কুরআনের আয়াত পড়ে দুই ( 2 )
রাকাত নামাজ সম্পন্ন করতে হবে
নিয়ম ⭐ দুই রাকাত শেষে সালাম ফিরানো
নিয়ম ⭐ সেই নিয়মে দুই ( 2 ) রাকাত করে
পরপর কিন্তু বিশ ( 20 ) রাকাত নামাজ পড়া
নিয়ম ⭐ সেই নিয়মে মোট বিশ ( 20 ) রাকাত
পড়া উত্তম ( সেটা পুরোপুরি সুন্নাহ ) তবেঃ আট
( 8 ) রাকাত তারাবির নামাজ পড় বৈধ আছে
নিয়ম ⭐ প্রতি চার রাকাত তারাবির নামাজের
পরপর সামান্য সময় বসে বিশ্রাম করা মুস্তাহাব
নিয়ম ⭐ বিশ ( 20 ) তারাবির নামাজ শেষ হলে
বিতর নামাজ আদায় করা আবার চাইলে আট
( 8 ) রাকাত তারাবির নামাজ পড়ার পর বিতরের
নামাজ আদায় করা যাবে অথবা আসতে পারেন
আর সেই সব নিয়মেই কিন্তু তারাবির নামাজ
সঠিকভাবে আদায় করতে হয় ⭐⭐⭐⭐
তারাবির নামাজ জামাতে পড়া কি জরুরি? ????
তারাবির নামাজ জামাতে পড়া ফরজ ও ওয়াজিব নয় তবেঃ সেটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া হিসেবে গণ্য। সহজ কথায় বললেঃ কোনো অঞ্চলে মসজিদে জামাত প্রতিষ্ঠিত থাকলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায় আর না থাকলে সবাই দায়ী হবে। রাসুল ﷺ কয়েক রাত সাহাবিদের নিয়ে জামাতে তারাবির নামাজ আদায় করেছিলেন পরে ফরজ হওয়ার আশঙ্কায় তা নিয়মিত করেননি। পরবর্তীতে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব ( রাঃ ) মুসলমানদের একতার জন্য মসজিদে জামাতের সাথে তারাবি চালু করেন। পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাতের সাথে তারাবি পড়া অত্যন্ত উত্তম আর সুন্নাহসম্মত আর মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজ জামাতের সাথে পড়া জরুরি নয়; তাদের জন্য ঘরে একা একা অথবা মহিলাদের জামাতে পড়া উত্তম আর অধিক পর্দাসম্মত তবেঃ চাইলে মসজিদে পড়া যেতে পারে।
আট রাকাত বনাম বিশ রাকাত তারাবির নামাজ নিয়ে বিতর্ক থাকার কারণ কী কী রয়েছে
🟠 হাদিস ব্যাখ্যার পার্থক্যঃ কিছু আলেম নবিজীর
( 11 ) রাকাত নামাজের হাদিসকে তারাবির সাথে
সম্পর্কিত মনে করেন আবার অধিকাংশ মুহাদ্দিস
তা তাহাজ্জুদ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন আর সেখান
থেকেই তারাবির নামাজ নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে
🟠 তাহাজ্জুদ আর তারাবির পার্থক্য না বোঝাঃ
রাতের নফল নামাজের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট না
থাকায় অনেকেই তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাতকে
তারাবির নামাজের রাকাত মনে করেন
🟠 সাহাবিদের আমল সম্পর্কে অজ্ঞতাঃ খলিফা
উমর ইবনুল খাত্তাব ( রাঃ ) সময় বিশ রাকাত
তারাবি জামাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঐতিহাসিক
তথ্য অনেকের জানা না থাকায় বিভ্রান্তি হয়েছে
🟠 মাযহাবভিত্তিক ফিকহি মতভেদঃ চার মাযহাবের
ফিকহে বিশ রাকাত সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
তবেঃ কিছু আলেম ভিন্ন ইজতিহাদ করেছেন তাতে
তারাবির নামাজ নিয়ে মতপার্থক্য স্থায়ী হয়েছে
🟠 সংক্ষিপ্ত নামাজের প্রবণতাঃ অনেক জায়গায়
দীর্ঘ কিরাতের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত নামাজ প্রচলিত
থাকায় কম রাকাতকে সহজ মনে করে আট
রাকাত তারাবির নামাজের প্রচার বাড়ে
🟠 আধুনিক যুগের মতবাদের প্রভাবঃ সমসাময়িক
কিছু দাওয়াহ আর আন্দোলন নির্দিষ্ট হাদিসের
আক্ষরিক অনুসরণে জোর দেওয়ায় আট রাকাত
তারবির নামাজের মত বেশি প্রচারিত হয়েছে
🟠 ঐক্যের চেয়ে মতের উপর জোরঃ মুসলিম
সমাজে ঐক্য বজায় রাখার পরিবর্তে নিজ মতকে
অগ্রাধিকার দেওয়ায় বিতর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করেছে
কোনটি অনুসরণ করা উচিত?
⭐ নিজ মাযহাবের অনুসরণ করা উত্তমঃ আপনি
যে ফিকহি মাযহাব মানেন তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী
আমল করা নিরাপদ আর গ্রহণযোগ্য আর চার
মাযহাবের অধিকাংশ আলেমের মতে বিশ ( 20 )
রাকাত তারাবির নামাজ পড়া হচ্ছে পুরোপুরি সুন্নাহ
⭐ মসজিদের জামাতের সাথে মেলানোঃ আপনার
অঞ্চলে মসজিদে সাধারণত যত রাকাত পড়া হয়
সেই অনুযায়ী পড়াই উত্তম কারণঃ জামাত আর
মুসলিম ঐক্য বজায় রাখা অনেক বেশি মূল্যবান
⭐ বিশ রাকাতকে পুরো সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ করাঃ
সাহাবিদের যুগ থেকে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব
( রাঃ ) সময় বিশ রাকাত নামাজ থাকায় অধিকাংশ
ফকিহ সেটাকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ বলেছেন
⭐ আট রাকাত পড়লে নামাজ সহিহ হয়ঃ কেউ
আট রাকাত পড়লে তারাবি আদায় হয়ে যায় তবেঃ
পুরোপুরি সুন্নাহর মর্যাদা কিন্তু বিশ রাকাতে বেশি
👉 তাই বিভ্রান্তিতে না পড়ে নিজের মাযহাব আর
মসজিদের অনুসরণে তত রাকাত তারাবির নামাজ
পড়াই হচ্ছে কিন্তু অধিক উত্তম আর খুব নিরাপদ
রমজান মাসের বিশেষ ইবাদত তারাবির নামাজ মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে ৮ ও ২০—দুই মত থাকলেও সাহাবিদের যুগ থেকে অধিকাংশ উলামার মতে ২০ রাকাতই পূর্ণ সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তবে ৮ রাকাত পড়লেও তারাবি আদায় হয়ে যায়—এটি শরিয়তসম্মত ও বৈধ। পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাতে এবং নারীদের জন্য ঘরে তারাবি পড়া উত্তম, যদিও উভয়ের জন্যই একই নিয়ম প্রযোজ্য। তাই মতভেদে বিভক্ত না হয়ে ঐক্য বজায় রাখা, নিজের মাযহাব ও মসজিদের অনুসরণ করা এবং নিয়মিত তারাবি আদায়ের মাধ্যমে রমজানের রাতগুলো ইবাদতে কাটানোই হওয়া উচিত মুমিনের লক্ষ্য। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যমই হলো তারাবির নামাজ।
